অঞ্জলি দেনন্দী, মমর একগুচ্ছ কবিতা --
১. ঢাক বাজে ওই
ইস্কুলের দোতলায় ঢাক বাজে ওই।
মা দুগ্গার পূজো হচ্ছে তো সেখানে।
আয় আয় আয়! ওলো যত সই!
সেজে নতুন সাজে যাই সেখানে।
মন যে টিকছে না আর এখানে।
ঘরে বসে থাকবো না আর তাই।
চল চল চল সবাই সেখানে যাই!
আর নয় ফোনে কথা।
সময় নষ্ট অযথা।
মা দুগ্গাকে করব দর্শন সামনে থেকে।
নোবো আশিস শ্রীপদে অঞ্জলি রেখে।
গ্রামের মেয়ে আমরা পূজি মাকে।
১০৮ পদ্মের মালায় সাজাই তাঁকে।
ঢাকি খুশি করে শব্দ সৃষ্টি করে ঢাকে।
২. চাঁদ
সত্যিই সুদূরের কি তুমি?
না, তোমার আলো যে ছোঁয় ভূমি।
অনন্ত প্রেম ঢালো।
অম্লান তোমার আলো।
ও গো চাঁদ!
এ মনে তোমার আসা তো অবাধ।
তোমার কিরণে, আবেশ জাগে মনে।
পুলকিত হই অকারণে।
তোমার রশ্মি মোহময় অতি।
অপ্রতিরোধ্য তার গতি।
তবুও অনাহারে ফুটপাতে পড়ে থাকি যখন
মনে হয় তুমি নিষ্ঠুর হাস্যকারী, ব্যাঙ্গকারী তখন।
তোমার আলো তো ক্ষুধা দূর করতে পারে না।
সে যে দারিদ্র্যের খালি পেটকে ধার ধারে না।
তাই তো তোমার রূপ গরীবের দৃষ্টি কাড়ে না।
৩. দামোদর
বুকে প্লাবন; প্রিয় শ্রাবণ মাস।
দামোদরের উচ্ছাস; তারই তীরে ছিল আমার বাস।
ঘোলা জল ঘুরে ঘুরে ঘুরে ছোটে।
সেই কল্লোলে দলবদ্ধ পানায় ফুল ফোটে
তরী করে এপার ওপার, নদের জলে।
ওপরে মেঘের কোলে বিদ্যুৎ ঝলমলে।
গুরু গম্ভীর স্বরে বজ্র গর্জন করে।তরতর করে বৃষ্টি নামে, নাওয়ের 'পরে।
আমি সেই নৌকোয় চড়ে হাট থেকে ফিরি ঘরে।
আমার গাঁ আর হাটের মাঝে, নৌকো চলে,
দিবানিশি, এই দামোদরে।
বর্ষা এলেই এই নদ ভরে বন্যার জলে।
তখন দামোদর বড় ক্ষতি করে।
বন্যা পৌঁছে যায় আশেপাশে।
গাঁ আমার বানে ভাসে।
৪. তুমি-আমি
আমি সাগরের উচ্ছাস।
তুমি আমার গভীরতার বিশ্বাস।
আমার নোনা নিঃশ্বাস, মেঘের সৃষ্টি।
ফের আমারই পরে ঝরে বৃষ্টি; আমার ঊর্ধ দৃষ্টি।
আকাশের প্রতিবিম্ব আনে।
আমি উচ্ছসিত জোয়ার, পূর্ণ শশীর টানে।
আমি সমৃদ্ধ আমারই তরঙ্গ-গানে।
আমি না থামা চঞ্চল; অনন্ত আমার জল;
তুমি আমার তলাতল, অতল;
আমি নদী মিলন-স্থল।
আমার আছে কাছে আনার-টানার বল;
আমার মন্থনে উত্থিত হলাহল।
করেছিলেন পান যিনি, নীলকন্ঠ - পূজ্য তিনি।
তাঁর কন্ঠ-পরশ আমি চিনি।
৫. চা
চা হল আবেগ।
সকালে চা পানের পর আসে মল-বেগ।
চা- দুপুরে, অফিস ব্রেকে, এনার্জী আনে।
বিকালের চা জমে - বাজনায়, গানে।
সন্ধ্যের চায়ের আড্ডা মানে,
দুনিয়ার গজব খবরই বটে।
চা যখন ঠোঁটে, গরম,
ক্যাফের টেবিলে, প্রেম কাহিনী ঘটে।
নিশি-চা, তা তো টানে
স্বপ্নালু-নিদ্রায়, শান্তির, পরম।
চা চাষে- অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।
চায়ের বাণিজ্যে অর্থলাভ হয়।
চা, এক দেশ থেকে বিভিন্ন দেশে যায়।
সর্বত্রই চায়ের জয়।
৬. সন্ধানী
সন্ধানী আঁখি।
খোঁজ পাওয়া আছে বাকি।
দানে কেনো সুখী ফল ভরা শাখী?
কেনো ঝরে পড়ে ফল, পাকি?
গায় কেনো পাখী?
কারণ খুঁজতেই থাকি।
নিদ্রা কেনো রঙিন স্বপ্ন-ছবি আঁকি?
ঐ যে রং-ধনু গগণে আছে বাঁকি,
ও কেনো স্পর্শের ঊর্ধে, শুধুই ফাঁকি?
পূর্ব ও পরজন্ম - সত্যই আছে তা কি?
সত্যই কর্মফল বলে কিছু আছে নাকি?
সত্যই সন্তান হিতাকাঙ্খী সকল মা কি?
কেনো তবুও তাকে মা বলে ডাকি?
কেনো বারে বারে আঁখি-পাতায় দৃষ্টি ঢাকি?
সন্ধানী আমি নিজেকে জানার সন্ধানেই রাখি।
৭. ফেরিওয়ালিনি
জলে ভেজায় ডাল, রাতেরবেলায়
দুহাতে নোরা দিয়ে ঘষে ঘষে ঘষে
শীলে বাটে তা ভোরবেলায়।
কাঠের পিঁড়িতে বসে।
পঞ্চাশ বছরের নন্দী-বুড়ি ও সে।
সূর্য ওঠার আগেই ও বড়ি দেয়
তার নিকোনো উঠোনে ধুতি মেলে।
দুপুরের রোদে সব শুকিয়ে নেয়।
তারপর সেগুলো উঠিয়ে নেয় খুলে খুলে।
দু পা লম্বা করে মেলে।
ধামা ভরে বড়িতে, তা নিয়ে কাঁখে ধরে তুলে।
এবার বড়ি নিয়ে সারাটাদিন ঘোরে
বাড়িতে বাড়িতে বাড়িতে।
বেচে পাল্লায় ওজন করে করে করে।
টাকা বাঁধে আঁচলে, পরণের সূতির শাড়িতে।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে এসে রাঁধে আর খায়।
তারপর আবার ডাল ভেজায়।
৮. অবলম্বন
একটা বাঁশের লাঠি।
সেটা ধরে আমি হাঁটি।
ওটাই আমার অবলম্বন।
পৃথিবী ঘোরে বন বন বন।
বয়স তাই ছোটে ছুঁতে মরণ।
বার্ধক্যে দুর্বল অন্তঃকরণ।
দেহের মধ্যে হাওয়া বইছে।
হৃদযন্ত্র ধক ধক ধক, কইছে।
ওরা একে অপরের অবলম্বন।
অতিক্রম করেছি জীবনের সব রণ।
অভিজ্ঞতার শেষ প্রান্তে এসে
এখন হাত, পা ক্লান্ত আমার।
তবুও আমি আত্মা হয়ে চলব অশেষে।
তখন কি হবে অবলম্বন আমার?
তা জানা নেই আমার।
৯. চুপচাপ তাল গাছ
তাল গাছের মাথার ওপরে, মেঘ জমেছে।
সূর্যের আলো তাই খুব কমেছে।
চুপচাপ তাল গাছ, দাঁড়িয়ে আছে।
দীঘি ভরা জলের অতি কাছে।
কর কর কর - করে মেঘ ডাকছে।
সারা আকাশটাই কালোতে ঢাকছে।
ঝম ঝম ঝম - করে নামলো জল।
মাঠে খেলছিল ফুটবল
পল্লীর পোলার দল।
দুম দাম শব্দে বাজ পরে।
পোলা সব ছুটে এলো ঘরে।
চকাত করে বিজলী চমকায়।
কেন যে মেঘ এতো ধমকায়?
চুপচাপ তাল গাছ হাপুই সোটা ভেজে।
আসমান থেকে এতো পানি ঢালছে কে যে?
১০. নীরব নিবিড় নিশা
আমি আর নীরব নিবিড় নিশা।
নিস্তব্ধ সকল দিশা।
নয়নে নিদ্রার তৃষা।
তারা বুকে দূরের গগণ।
শশী জ্যোৎস্নার প্রেমে মগণ।
মিষ্টি মধুর শান্ত লগণ।
উড়ন্ত নিশাচর।
নির্ভীক খেচর।
সিক্ত বালুচর।
উত্তাল নিঃসঙ্গ তরঙ্গ।
কার যেন অন্তরঙ্গ হতে চায় মম অঙ্গ।
পেতে চায় কার যেন সঙ্গ।
হাওয়া নিজ মনে বয়।
শীতল পরশে আপন হয়।
শ্বাসে সৃষ্টি করে ছন্দ, তাল, লয়।
১১. হারমোনিয়াম
হারমোনিয়াম।
ওরে বাবাঃ, কি বিরাট নাম!
আমি শিল্পী, আপন করে নিলাম।
দুহাতের জোরে বাজে।
বাতাস ব্যস্ত হয় কাজে।
মন জয় করে মধুর আওয়াজে।
সা রে গা মা পা ধা নি সা.........
হারমোনিয়ামের একান্ত ভাষা।
স্বরের ভালোবাসা।
বাজে যত।
সৃষ্টি করে তত।
অমরত্ব দিল কত কত কত।
স্বর্গীয় পথ ও।
ধ্বনি, সুধার মত।
প্রিয়বৎ ও।
১২. শিশু
শিশু তো ছিল সবাই।
সবারেই গর্ভে ধারণ করেছিল মা-ই।
শৈশবের চেয়ে সুখের আর কিছুই নাই।
শিশুকালকে ছাড়া কোনো জীবনই নয়।
ভালবাসা দিয়ে শিশু করে মন জয়।
শিশুর মধ্যেই স্বয়ং ঈশ্বর রয়।
মাকের বক্ষ সুধা পান করে বড় হয়।
প্রথম শব্দ - "মা" - কয়।
শিশুই বংশ প্রবাহ বয়।
শিশুই আগামীর পরিচয়।
কর্মের সঞ্চয়।
শিশুর জন্য পৃথিবী প্রাণে অক্ষয়।
শিশু স্বভাব-উল্লাসী।
শিশুর মুখের সরল হাসি,
আমি বড় ভালোবাসি।
No comments:
Post a Comment